সভ্যতার পথঃ

সভ্যতার পথঃ
5
7809

সভ্যতার পথঃ

সংস্কৃতি ও সভ্যতার মধ্যে পার্থক্য

হার্বার্ট জর্জ ওয়েলস

ব্রিটিশ লেখক ও সাহিত্যিক
সর্বোৎকৃষ্ট সমাজ ব্যবস্থা
“ইসলাম বিশ্বকে নেতৃত্ব দিয়েছে। কেননা ইহা ছিল সে যুগের সর্বোত্তম সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা। ইহা ব্যাপকহারে প্রসার লাভ করেছে, কেননা সর্বত্রই রাজনৈতিক দিক থেকে কিছু নির্বোধ লোক ছিল, যাদের অধিকার হনন করা হতো, তাদের প্রতি জুলুম অত্যাচার করা হতো, তাদেরকে ভয় ভীতি দেখানো হতো, তারা ছিল অশিক্ষিত ও রাষ্ট্র কিভাবে পরিচালনা করে তা জানতোনা। এছাড়াও কতিপয় স্বৈর ও দুর্বল শাসক পাওয়া যায়, যাদের সাথে জনগণের কোন সম্পর্ক নেই। ইসলামই বিশ্বের জন্য অদ্যবদি কার্যকর প্রশস্ত, অত্যাধুনিক ও নির্মল রাজনৈতিক চিন্তাধারা নিয়ে এসেছে। ইহা মানব জাতিকে অন্য সব ব্যবস্থপনার চেয়ে উত্তম ব্যবস্থপনা উপহার দিয়েছে। ইসলামের আগমনের পূর্বে রোমান সাম্রাজ্যে শুল্কাধীন পুঁজিবাদী ব্যবস্থা আর ইউরোপে সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং সামাজিক পরম্পরা ব্যবস্থা সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছিল ও ভেঙ্গে পড়েছিল “।

উন্নত অনুন্নত এমন কোন জাতি বা গোষ্ঠী পাওয়া যাবেনা যাদের সংস্কৃতি নাই, যা তাদের স্বভাবের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকে। সংস্কৃতি হলো জীবন যাপনের পথ, জীবন ও অস্তিত্বের অবস্থান, সুউচ্চ নীতিমালা ও সামাজিকতা যা জীবনের বাহ্যিক দিক ও রূপকে নির্দেশ করে। সকল কার্যকলাপ ও আচার আচরণের প্রতিফলন। ইহা সমাজকে প্রিয় অভ্যাসে অভ্যস্থ করে এবং তার উপর অটল থাকাকে সংরক্ষন করে। আর সভ্যতা হলো সমাজের সংস্কৃতির সাথে বাড়তি একটি বৈশিষ্ট্য, যা অগ্রগতি, উন্নতি, ব্যক্তি ও সমষ্টিক সফলতা, বাস্তবতার আলোকে অর্জন, ইতিহাসের পাতায় উল্লেখযোগ্য প্রভাব, কোন কিছু সৃষ্টিতে কার্যকর ভুমিকা, এমন কার্যকারিতা যা স্থান ও কালের সীমা ছড়িয়ে একত্রিত ও আলাদা রূপে দীপ্তশীল, এসব কিছুকে শামিল করে। এভাবেই সকল সভ্যতা প্রকৃতি, পরিবেশ, রাজনীতি, ধর্ম, সংস্কৃতি, বিজ্ঞান ও আখলাকের সাথে বুনন ও গভীর সম্পর্কের মাধ্যমে সৃষ্টি করে। উক্ত উপাদানগুলো আমরা একই পাত্রে মিশ্রিত দেখি, ইহাই একটি জাতির সভ্যতা, ইহাই উক্ত জাতির বৈশিষ্ট্য ও গুনাবলী।

মানুষের ইসলামী সভ্যতা সম্মান

মন্টগোমারি ওয়াট

ব্রিটিশ প্রাচ্যবিশেষজ্ঞ
আত্ম অহংকারের আলামতসমূহ
“বর্তমানে ইউরোপে ইসলামের প্রভাব ও অবদানের উপর একটি গবেষণা প্রকাশ করা খুবই জরুরী; যখন বিশ্বে মুসলমান ও আরব খ্রিস্টানদের সাথে ইউরোপীয়দের সম্পর্ক বৃদ্ধি পাচ্ছে। গবেষণায় দেখা গেছে যে, মধ্যযুগে ইউরোপীয় খৃষ্টান লেখকরা ইসলামের নানা বিকৃতরূপে তুলে ধরেছে। তবে গত শতকের গবেষকদের প্রচেষ্টায় পশ্চিমাদের মনে অনেকটা নিরপেক্ষ ও সত্য চিত্র গঠিত হচ্ছে। আরব ও মুসলমানদের সাথে সুসম্পর্কের কারণে আমাদের উচিত মুসলমানদের অবদানগুলো স্বীকার করা। অন্যদিকে এ সব অবদান অস্বীকারে শুধু মিথ্যা অহংকারই প্রকাশ পাবে”।

এভাবে আমরা দেখি যে, ইসলাম অসহিষ্ণু ও অনুন্নত একটি গোষ্ঠীকে মহান আখলাক, সুউচ্চ মূলনীতিবান জাতিতে পরিণত করেছে। মাত্র কয়েক দশকের মাঝে তাদের মধ্যে এমন নাগরিকতা ও সভ্যতা বিস্তার করে, যার দ্বারা তারা পৃথিবী জয় করে নেয়। এ সভ্যতায় সে সময়ে অনেক জনগোষ্ঠীই সাড়া দিয়েছিল, কেননা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে দ্বীনের সুসংবাদ দিয়েছিলেন তা ছিল সহজ-সরল, ন্যায়নীতি, ভ্রাতৃত্ব ও সাম্যে ভরপুর। ইসলামের সভ্যতা এমন এক সময় এসেছিল যখন মানুষ দাসত্ব ও স্বৈরশাসনের পুরাতন রাষ্ট্র ব্যবস্থায় অতিষ্ট হয়ে পড়েছিল। তারা এ নতুন ব্যবস্থাপনায় আকৃষ্ট হলো, কেননা তারা দেখলো রাজা বাদশাদের স্বৈরচারিতা, একনায়কতন্ত্রের নির্যাতনের পরিবর্তে এতে রয়েছে তাদের জন্য সম্মানবোধ ও মানবতা। ফলে ইসলামই তাদের জন্য ছিল এক সোনালী সুযোগ। কেননা ইহা তাদের অনেক সমস্যার সমাধান দিয়েছে, তারা এখানে সম্মানিত জীবন পেয়েছে, যা তারা প্রত্যাশা করত। এমনিভাবে ইসলাম তাদের থেকে জুলুম, নির্যাতন, অজ্ঞতা ও পশ্চাদপসারতা দূর করল।

ইসলামী সভ্যতা মানুষকে সম্মান দিয়েছে। গোত্র, বর্ণ বা ভাষার কারণে একে অন্যের উপর কোন আলাদা মর্যাদা বা পার্থক্য করেনি। বরং সকলেই আচরণ ও অধিকারের ক্ষেত্রে সমান। মানব জাতির অগ্রগতিতে ইসলামী সভ্যতা কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। গোত্রীয় স্বৈরতন্ত্র যা রক্ত ও বংশের ভিত্তিতে গড়ে উঠত, তা পরিবর্তন করে আক্বীদা ও চিন্তাভাবনায় একই সমগোষ্ঠীর পদ্ধতি চালু করেছে, যা ভ্রাতৃত্ব ও সাম্যের ভিত্তিতে সামাজিক বন্ধন সৃষ্টি করে।

মারমাদুক পিৎথাল

ইংরেজ সাহিত্যিক ও চিন্তাবিদ
বিশ্বের আত্মাহুতি
“অন্য সময়ের চেয়ে এ সময় পশ্চিমাদের ইসলাম খুবই প্রয়োজন, যাতে তারা জীবনের অর্থ খুঁজে পায়, ইতিহাসের গুরুত্ব ও তাৎপর্য বুঝতে পারে এবং যেন পশ্চিমা বিশ্বে বিজ্ঞান ও ধর্মের মাঝে যে বৈপরিত্য আছে তা পরিবর্তন করতে পারে। ইসলাম কখনও বিজ্ঞান ও ঈমানের মাঝে বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি করেনি, বরং এ দুয়ের মাঝে পরিপূরক সম্পর্ক সৃষ্টি করেছে যা বিচ্ছিন্ন হয়না। এমনিভাবে ইসলাম আমাদের পাশ্চাত্য সমাজে আশা আকাঙ্ক্ষাকে সামগ্রিকভাবে পুনরুজ্জীবিত করতে পারে যা ক্রমাগত সমগ্র বিশ্বকে আত্মাহুতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে।।

ইসলামের দৃষ্টিকোণে সভ্যতার প্রথম লক্ষ্যই হলো সুখ-শান্তি, নিরাপত্তা বাস্তবায়ন, সুন্দর সমাজ গঠন, যে সব জিনিসে কল্যাণ আছে তা দিয়ে মানুষকে সুখী করা এবং সব ধরণের অকল্যাণের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা। যেহেতু সামাজিকভাবে নানা উপায়ে সভ্যতার উন্নতি মূলত মূল লক্ষ্য-উদ্দেশ্য নয়। বরং প্রকৃত সভ্যতার উদ্দেশ্য হলো সমাজ ও দেশে শান্তি, নিরাপত্তার মাধ্যমে মানুষের মানসিক সুখ, আন্তরিক প্রশান্তি আনা। আর ইহা সম্ভব হয় ভাল ও কল্যাণকর কাজ করা ও মন্দ ও খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে।

আধুনিক সভ্যতা ইহার বিপরীত, কেননা তা নিরাশা ও উদ্বিগ্নতা বাড়িয়ে দেয়। মানুষকে অন্যায়ভাবে শারীরিক ও জৈবিক ভ্রষ্টতার নিষ্পেষণে ভোগায়। আর আখলাক-চরিত্র, সম্মানবোধ, ধার্মিকতা ইত্যাদি সুউচ্চ মানবিক গুনাবলী থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। মানুষকে যান্ত্রিক করে তোলে, তার কোন আত্মা থাকেনা, শক্তিশালীরা দুর্বলকে জুলুম নিষ্পেষণ করে।




Tags: